০৯:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় থেকে উদ্যোক্তা—মাত্র ৩০ হাজার টাকা ও ৭টি ছাগল নিয়ে ‘ক্বমারুন এগ্রো ফার্ম’-এর স্বপ্নযাত্রায় জুবাইদ হোসেন জিয়ান ও ইখতিয়ার উদ্দিন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৪৬:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬ ২০৮ বার পড়া হয়েছে

kalapara

আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জুবাইদ হোসেন জিয়ান ও ইখতিয়ার উদ্দিনের পরিচয় সামাজিক মাধ্যমে। গল্প আর আড্ডা–এটিই যেখানে অধিকাংশ বন্ধুত্বের সীমা, সেখানে জিয়ান ও ইখতিয়ারের বন্ধুত্ব একটুখানি ব্যতিক্রম। আগ্রহের সেই মিল যখন এক বিন্দুতে এসে ঠেকে, তখন আর থেমে থাকার কারণ থাকেনি। দু’জন মিলে দিলেন দশ হাজার টাকা, সঙ্গে যুক্ত হলো আরও চার বন্ধুর পুঁজি। সর্বসাকল্যে ত্রিশ হাজার টাকা আর সাতটি ছাগল নিয়ে ‘ক্বমারুন এগ্রো ফার্ম’-এর যাত্রা শুরু।
পড়াশোনা এবং কাজ
জুবাইদ হোসেন জিয়ান ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ আর ইখতিয়ার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনা ঠিক রেখেই তারা কৃষি উদ্যোক্তা হয়েছেন। তবে এতে একটু চাপ তো পড়েই। তবে বুদ্ধি করে সব সামলে নেন। দু’জনই মনে করেন, ছাত্ররা পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি নিয়ে কাজ করতে পারে। এ জন্য থাকা চাই দৃঢ় মনোবল ও সামাজিক বাধা উপেক্ষার মানসিকতা। 
আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রমই সম্বল
উপকারী প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও ছাগল শব্দটি অনেক সময় মানুষকে ব্যঙ্গার্থেই ব্যবহার করা হয়। সেই ছাগল দিয়ে যখন ফার্ম শুরু করলেন জিয়ান ও ইখতিয়ার, তখন একদল মানুষ যেন রীতিমতো আলোচনার খোরাক পেয়ে গেল। কেউ বলল, ‘লেখাপড়া করে এখন ছাগল পালছো?’ কেউ আবার বলল, ‘এই ছাগলের কারণেই বন্ধুত্বও বেশিদিন টিকবে না!’ এমন কত কিছুই না শুনতে হয়েছে তাদের। কিন্তু অদম্য এই দুই তরুণ ছিলেন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। 
দুটি শাখায় চলছে কার্যক্রম
এই ফার্মের দুটি শাখা। প্রথমটি পটুয়াখালীতে, অপরটি ময়মনসিংহে। এছাড়া আরও দুটি শাখা উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে তাদের ফার্মে ১০০টি ছাগল, ১২টি গরু আছে। কয়েকটি পুকুরেও মাছের চাষ হচ্ছে। সঙ্গে সবজির আবাদ তো আছেই। বাবা-মায়ের দেওয়া জমিতেই ফার্ম করেছেন তারা। প্রায় ২০ বিঘার অধিক জমিতে তাদের ফার্মের কার্যক্রম। তাদের দলে রয়েছেন ১০ জন উপদেষ্টা, ৯ জন পরিচালক, ৪ জন ম্যানেজার, ৮ জন কর্মচারী এবং ৭ জন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর।  
ব্যর্থতার মই বেয়ে সফলতার দেখা
জিয়ান ও ইখতিয়ার আজ যেখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন না কেন, তাদের পেছনের গল্পটা শুধুই সাফল্যের নয় বরং ব্যর্থতার দীর্ঘ এক ইতিহাস। জিয়ান একে একে সাতটি উদ্যোগে ব্যর্থ হয়েছেন। পাঞ্জাবির ব্যবসা, খাবারের ব্যবসাসহ নানান চেষ্টার পরও সাফল্য ধরা দেয়নি। অন্যদিকে ইখতিয়ার উদ্দিন সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। তবে এত কিছু সত্ত্বেও তারা ভেঙে পড়েননি। নিজেদের মতো করে উঠে দাঁড়িয়েছেন, শিখেছেন প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে। এই অভিজ্ঞতাগুলো শুধু তাদের সমৃদ্ধই করেনি, বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ও দিকনির্দেশনাও দিয়েছে।
লোকসানে অটুট মনোবল
একবার এক বিশেষ কারণে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার মতো বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন তারা। এমন অবস্থায় ভেঙে পড়াটা খুব স্বাভাবিক হলেও জিয়ান ও ইখতিয়ার ছিলেন ব্যতিক্রম। তারা একে অপরকে সাহস জুগিয়েছেন। পাশে থেকেছেন সংকটের মুহূর্তে। তাদের ইস্পাত-দৃঢ় মনোবলই হয়ে উঠেছে এগিয়ে চলার প্রধান শক্তি। হতাশ না হয়ে বরং সেই লোকসানকে তারা পরবর্তী সাফল্যের জন্য এক শিক্ষার জায়গা হিসেবে দেখেছেন।
উদ্যোক্তা তৈরিতে উদ্যোগ
এই দুই তরুণ শুধু নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে থেমে যাননি, বরং অন্য তরুণদেরও কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে চলেছেন। জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত একাধিক সেমিনারে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। ২০২৪ সালে এক সম্মেলনে তারা বক্তব্য রাখেন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ১৫০ জন অংশগ্রহণকারী। এরপর ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে তারা আরও বড় পরিসরে ৩০০ জন মানুষের সামনে কথা বলেন, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছিল এক অনুপ্রেরণার উৎস। 
আগামীর ভাবনা
দুইজনেরই স্বপ্ন, একসঙ্গে বিশ্বজয় করা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই তারা নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছেন। নতুনদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা দুই বন্ধু আমাদের জীবনে নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। তবে কখনও কেউ কাউকে ছাড়িনি। একসঙ্গে লড়েছি। তরুণদের প্রতি আহবান থাকবে তারা যেন বন্ধুকে স্বার্থের জন্য ব্যবহার না করে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় থেকে উদ্যোক্তা—মাত্র ৩০ হাজার টাকা ও ৭টি ছাগল নিয়ে ‘ক্বমারুন এগ্রো ফার্ম’-এর স্বপ্নযাত্রায় জুবাইদ হোসেন জিয়ান ও ইখতিয়ার উদ্দিন

আপডেট সময় : ০৩:৪৬:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

জুবাইদ হোসেন জিয়ান ও ইখতিয়ার উদ্দিনের পরিচয় সামাজিক মাধ্যমে। গল্প আর আড্ডা–এটিই যেখানে অধিকাংশ বন্ধুত্বের সীমা, সেখানে জিয়ান ও ইখতিয়ারের বন্ধুত্ব একটুখানি ব্যতিক্রম। আগ্রহের সেই মিল যখন এক বিন্দুতে এসে ঠেকে, তখন আর থেমে থাকার কারণ থাকেনি। দু’জন মিলে দিলেন দশ হাজার টাকা, সঙ্গে যুক্ত হলো আরও চার বন্ধুর পুঁজি। সর্বসাকল্যে ত্রিশ হাজার টাকা আর সাতটি ছাগল নিয়ে ‘ক্বমারুন এগ্রো ফার্ম’-এর যাত্রা শুরু।
পড়াশোনা এবং কাজ
জুবাইদ হোসেন জিয়ান ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ আর ইখতিয়ার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনা ঠিক রেখেই তারা কৃষি উদ্যোক্তা হয়েছেন। তবে এতে একটু চাপ তো পড়েই। তবে বুদ্ধি করে সব সামলে নেন। দু’জনই মনে করেন, ছাত্ররা পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি নিয়ে কাজ করতে পারে। এ জন্য থাকা চাই দৃঢ় মনোবল ও সামাজিক বাধা উপেক্ষার মানসিকতা। 
আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রমই সম্বল
উপকারী প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও ছাগল শব্দটি অনেক সময় মানুষকে ব্যঙ্গার্থেই ব্যবহার করা হয়। সেই ছাগল দিয়ে যখন ফার্ম শুরু করলেন জিয়ান ও ইখতিয়ার, তখন একদল মানুষ যেন রীতিমতো আলোচনার খোরাক পেয়ে গেল। কেউ বলল, ‘লেখাপড়া করে এখন ছাগল পালছো?’ কেউ আবার বলল, ‘এই ছাগলের কারণেই বন্ধুত্বও বেশিদিন টিকবে না!’ এমন কত কিছুই না শুনতে হয়েছে তাদের। কিন্তু অদম্য এই দুই তরুণ ছিলেন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। 
দুটি শাখায় চলছে কার্যক্রম
এই ফার্মের দুটি শাখা। প্রথমটি পটুয়াখালীতে, অপরটি ময়মনসিংহে। এছাড়া আরও দুটি শাখা উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে তাদের ফার্মে ১০০টি ছাগল, ১২টি গরু আছে। কয়েকটি পুকুরেও মাছের চাষ হচ্ছে। সঙ্গে সবজির আবাদ তো আছেই। বাবা-মায়ের দেওয়া জমিতেই ফার্ম করেছেন তারা। প্রায় ২০ বিঘার অধিক জমিতে তাদের ফার্মের কার্যক্রম। তাদের দলে রয়েছেন ১০ জন উপদেষ্টা, ৯ জন পরিচালক, ৪ জন ম্যানেজার, ৮ জন কর্মচারী এবং ৭ জন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর।  
ব্যর্থতার মই বেয়ে সফলতার দেখা
জিয়ান ও ইখতিয়ার আজ যেখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন না কেন, তাদের পেছনের গল্পটা শুধুই সাফল্যের নয় বরং ব্যর্থতার দীর্ঘ এক ইতিহাস। জিয়ান একে একে সাতটি উদ্যোগে ব্যর্থ হয়েছেন। পাঞ্জাবির ব্যবসা, খাবারের ব্যবসাসহ নানান চেষ্টার পরও সাফল্য ধরা দেয়নি। অন্যদিকে ইখতিয়ার উদ্দিন সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। তবে এত কিছু সত্ত্বেও তারা ভেঙে পড়েননি। নিজেদের মতো করে উঠে দাঁড়িয়েছেন, শিখেছেন প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে। এই অভিজ্ঞতাগুলো শুধু তাদের সমৃদ্ধই করেনি, বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ও দিকনির্দেশনাও দিয়েছে।
লোকসানে অটুট মনোবল
একবার এক বিশেষ কারণে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার মতো বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন তারা। এমন অবস্থায় ভেঙে পড়াটা খুব স্বাভাবিক হলেও জিয়ান ও ইখতিয়ার ছিলেন ব্যতিক্রম। তারা একে অপরকে সাহস জুগিয়েছেন। পাশে থেকেছেন সংকটের মুহূর্তে। তাদের ইস্পাত-দৃঢ় মনোবলই হয়ে উঠেছে এগিয়ে চলার প্রধান শক্তি। হতাশ না হয়ে বরং সেই লোকসানকে তারা পরবর্তী সাফল্যের জন্য এক শিক্ষার জায়গা হিসেবে দেখেছেন।
উদ্যোক্তা তৈরিতে উদ্যোগ
এই দুই তরুণ শুধু নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে থেমে যাননি, বরং অন্য তরুণদেরও কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে চলেছেন। জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত একাধিক সেমিনারে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। ২০২৪ সালে এক সম্মেলনে তারা বক্তব্য রাখেন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ১৫০ জন অংশগ্রহণকারী। এরপর ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে তারা আরও বড় পরিসরে ৩০০ জন মানুষের সামনে কথা বলেন, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছিল এক অনুপ্রেরণার উৎস। 
আগামীর ভাবনা
দুইজনেরই স্বপ্ন, একসঙ্গে বিশ্বজয় করা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই তারা নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছেন। নতুনদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা দুই বন্ধু আমাদের জীবনে নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। তবে কখনও কেউ কাউকে ছাড়িনি। একসঙ্গে লড়েছি। তরুণদের প্রতি আহবান থাকবে তারা যেন বন্ধুকে স্বার্থের জন্য ব্যবহার না করে।