১০:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

খালেদার জানাজায় বিপুল উপস্থিতি বিএনপির নির্বাচনে জোয়ার এনেছে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫৬:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬ ৭০ বার পড়া হয়েছে

কলাপাড়া

আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ইতিহাসের সর্ববৃহৎ গণজমায়েতকে জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই বিপুল মানুষের উপস্থিতি শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের অংকে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে।

দল-মত নির্বিশেষে খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের সহানুভূতি, ভালোবাসা ও আবেগ বিএনপি এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি জনসমর্থন বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন ও দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিএনপিকে নতুন করে জনমনে জায়গা করে দিচ্ছে।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নেন কোটির বেশি মানুষ। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার মূল মাঠ, সংলগ্ন দুটি মাঠ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, খামারবাড়ি মোড় থেকে ফার্মগেট হয়ে কারওয়ানবাজার পার হয়ে প্রায় শাহবাগ, বিজয় সরণি হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়কজুড়ে কাতারবদ্ধ হয়ে জানাজায় অংশ নেয় সাধারণ মানুষ। চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনের সড়ক, শিশুমেলা থেকে আসাদগেট হয়ে ধানমন্ডি ৩২ পর্যন্ত এলাকাতেও ছিল মানুষের ঢল। অন্যদিকে শিশুমেলা থেকে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত ছিল মানুষের ঢল।এছাড়া নিচের সড়কে জায়গা না পেয়ে এক্সপ্রেসওয়ে, বিভিন্ন ভবনের ছাদ, ফুট ওভার ব্রিজ ও মেট্রো স্টেশনের ভেতরেও মানুষ কাতারবদ্ধ হয়ে জানাজায় অংশ নেয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, এক থেকে দেড় কোটি মানুষ মানুষ সরাসরি জানাজায় অংশ নেয়। এছাড়া সারা দেশের জেলা-উপজেলায় গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন আরও লাখ লাখ মানুষ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃশ্য বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।তারা মনে করছেন, জানাজা ঘিরে সৃষ্টি হওয়া আবেগ ও জনসমর্থন আগামী নির্বাচনের মাঠে দলীয় কর্মীদের আরও সক্রিয় ও সংগঠিত ভূমিকা রাখতে অনুপ্রাণিত করবে।

জানাজায় রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, তিন বাহিনী প্রধান, শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, আলেম-ওলামা ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও জানাজাটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্পিকারসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিএনপির প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে একটি ইতিবাচক মনোভাব ও সহানুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, খালেদা জিয়ার জানাজায় এই বিপুল গণজমায়েত বিএনপির প্রতি জনমতের শক্ত অবস্থানকেই দৃশ্যমান করেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে আবেগ বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে, এ বাস্তবতায় খালেদা জিয়াকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সব মিলিয়ে, খালেদা জিয়ার জানাজা শুধু একজন নেত্রীর শেষ বিদায় নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে জনমত গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব আগামী নির্বাচনের ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয় বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

কেন খালেদা জিয়া জনমানুষের হয়ে উঠেছেন?
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি সংবিধান স্থগিত করে সামরিক আইন জারি করেন। এতে গণতন্ত্র চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৮৩ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপির নেতৃত্বে আসেন খালেদা জিয়া। তিনি প্রথমে এককভাবে ও পরে ৭ দলীয় জোট গঠন করে এরশাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জন করে বিরোধিতা করেন, যা তৎকালীন বিরোধীদের মধ্যে দৃঢ় নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে। ১৯৮৭-৯০ পর্যন্ত টানা হরতাল, মিছিল, সমাবেশ, গণআন্দোলনের মাধ্যমে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ঘটে, যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া ও বিএনপি।

১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক এরশাদকে পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জয়ী হয়। খালেদা জিয়াই প্রথম গণভোটের মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেন, যা গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করে। ১৯৯১ সালের বারোতম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্সিয়াল থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেন তিনি, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তনের অন্যতম বড় মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। খালেদা জিয়ার আমলেই ১৯৯৬ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।

বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তিনি গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। সংসদে ও সংসদের বাইরেও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ও সেটি বাস্তবায়ন করেন খালেদা জিয়া। যার ফলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম হয়, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য বড় অর্জন।

তার আমলেই নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের ক্ষেত্র তৈরি হয়। সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসারেও খালেদা জিয়া ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রহরণ শুরু হয়। প্রতিরোধ গড়ে তোলেন খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে। দলটির প্রধান শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা পাওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতাদের প্রতি দমনমূলক আচরণ শুরু করেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী দলের কার্যক্রমে বাধা, রাজনৈতিক হত্যা ও হয়রানির অভিযোগ করে বিএনপি।

আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে ২০০৯ সালে। প্রারম্ভ হয় একদলীয় শাসনের। দেশের গণতন্ত্র ভেঙে টুকরো টুকরো হতে থাকে। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয় আওয়ামী প্রহসন। খালেদা জিয়া ও তার দলের শীর্ষ নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের খড়্গ চালাতে থাকে আওয়ামী সরকার। সে বছর শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত হয় একতরফা নির্বাচন। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি বড় দল সেই নির্বাচন বর্জন করে। এতে শতাধিক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ হয় আওয়ামী লীগ। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় ২০১৮ সালের নির্বাচনেও। সেবার ব্যাপক কারচুপি, ভোট ডাকাতি ও ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে ক্ষমতা নেয় আওয়ামী লীগ। এরপর থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা, গ্রেপ্তার ও বিচারবহির্ভূত দমননীতি চালু করে দলটি।

এতসব ঘটনার পরও খালেদা জিয়া দৃঢ় ছিলেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করতে তিনি জনগণকে সংগঠিত করেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যান। তার তোপ দিন দিন এত বেশি প্রগাঢ় হতে শুরু করে, ভয় পেয়ে যায় শাসক দল। ফলে তার বিরুদ্ধে শুরু হয় রাজনৈতিক হয়রানি। ২০১৮ সালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার। কারাগারে বারে বারে অসুস্থ হন বিএনপি চেয়ারপারসন। একে তো বন্দিদশা, তার ওপর শারীরিক অসুস্থতা। তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি অপরাজনীতির কুশীলবরা। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি থেকে পিছু হটেননি খালেদা জিয়া।

২০২৪ সালের নির্বাচনে আমি-ডামি ভোট করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গলা কাটে আওয়ামী লীগ। অসুস্থ অবস্থায় তখনও বন্দী খালেদা জিয়া। তারপরও দেশ ও দশের কথা চিন্তা করেছেন তিনি। প্রকাশ্যে বা প্রত্যক্ষভাবে না হলেও আন্দোলন চালিয়ে যেতে গোটা দেশের মানুষের প্রতি বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি। নেতাকর্মীদের ধরে রেখেছিলেন আপসহীনতার চাদরে। কোটা প্রথা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফ্যাসিস্ট সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ৩৬ দিনের আন্দোলনে দেশবাসী কালো আওয়ামী খোলস ছিঁড়ে ফেলে। দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন হয়। খালেদা জিয়া মুক্তি পান বর্বরদের মিথ্যা থেকে। সাজানো নাটক থেকে। মুক্ত বাতাসে খালেদা দেন সহনশীলতার বার্তা।

চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপটে পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। এই পরিস্থিতিতে ওই বছরের ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির এক সমাবেশে সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তা দেন দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি বলেছিলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।’ তার কণ্ঠে সেই উচ্চারণ দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা প্রশমনে ভূমিকা রাখে, দেশবাসী খুঁজে পায় সাহস।

পুলিশ কর্মকর্তারাই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, বেগম জিয়ার সংযত ও দায়িত্বশীল বক্তব্যে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান যেমন ছিল, তেমনি ছিল দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর মমতা। কঠিন সেই সময়ে তার কণ্ঠে দেশবাসী খুঁজে পেয়েছিল সাহস, স্থিরতা ও আশার বার্তা। 

এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্তব্য করেছিলেন যা দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত অনুধাবন করে। যেমন, ‘ওদের হাতে গোলামীর জিঞ্জির আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি আওয়ামী লীগকে কেবল একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে নয়, বরং একটি নির্ভরশীল, পরাধীন ও ক্ষমতা-আসক্ত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। তার এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, তারা দেশের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না হয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ভর করেছে বিদেশি সমর্থন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দমনমূলক ব্যবস্থার ওপর।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিএনপি বিশ্বাসকে তুলে ধরেছিলেন। শহীদ জিয়ার পর তার হাতেই বহুদলীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম রাষ্ট্রচিন্তার ধারণা রক্ষা পেয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া কেবলই গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানার বিষয়ে চিন্তা করতেন। 

১/১১’র সময়কার সরকার দেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু’ ফরমুলা নিয়ে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া এমন হঠকারী চিন্তা নিয়ে কখনোই বিচলিত ছিলেন না। নিজের ও সন্তানদের চিন্তা না করে তিনি বরাবরই দেশ ও জাতিকে বেছে নিয়েছিলেন। এক সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার এই স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’

তাকে বার বার দেশ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল। এমনকি শহীদ জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। এ ঘটনায় বেগম জিয়া বিবশ হয়ে পড়লেও বিচলিত হয়ে যাননি। তিনি এই দেশকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসতেন। 

‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। দেশই হলো আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মাটি মানুষই আমার সবকিছু। এমন আবেগমাখা বক্তব্যও তিনি দিয়েছিলেন বিদেশের মাটিতে বসে। চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সময়ও তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। 

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমণ আকস্মিক হলেও তার এই যাত্রা ছিল দেশের মানুষকে নিয়ে পরিকল্পিত। কারণ তিনি দেশের প্রতিটি মানুষকে নিয়ে চিন্তা করতেন। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলের মানুষের জন্যও তিনি চিন্তা করতেন। তা না হলে শাপলা চত্বরে আওয়ামী হত্যাকাণ্ডকে তিনি কখনোই গণহত্যা বলতে পারতেন না। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কাদের মোল্লাদের গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ডকে তিনি ‘মিথ্যা রায়’ বলে আখ্যা দিতে পারতেন না। 

বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিও ছিল প্রখর। তিনি বলেছিলেন, এদের (আওয়ামী লীগ) পচতে আরও একটু সময় দিতে হবে। এজন্য আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। এই আওয়ামী লীগ একদিন পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়াবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন এই সরকার জনবিক্ষোভে ‘করুণভাবে’ বিদায় নেবে। সবাই যখন এদের বিরুদ্ধে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে, তখন তারা জনগণের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। ঘটেছেও তাই। দেশের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল বলেই আওয়ামী লীগ দেশ থেকে পালিয়েছে। কিন্তু রয়ে গেছেন খালেদা জিয়া। তার মা, মাটি ও মানুষের কাছে। 

বিএনপি সরকারের এ সফলতা দেখে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো উপবৃত্তি কর্মসূচি ও নারী শিক্ষাবিষয়ক প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহী হয়ে ওঠে। নরওয়ে, কানাডা, ও জার্মানি সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি নারী শিক্ষা প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষায় সবচেয়ে দ্রুত উন্নত দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে। নারী শিক্ষায় সরকারের কার্যক্রম জাতিসংঘের বিভিন্ন শিক্ষা ও উন্নয়ন সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বেইজিং বিশ্ব নারী সম্মেলন ১৯৯৫।

এসব কারণেই বেগম জিয়া দেশ ও জাতির হতে পেরেছিলেন। কেবল শেখ হাসিনা ও তার মত প্রকাশ করেন এমন হাতে গোনা কয়েকজন রাজনৈতিক তাকে সম্মান করেননি, কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন সর্বজন স্বীকৃত এমন সম্মানিত ব্যক্তি। নয়ত কোটিরও বেশি মানুষ তার জানাজায় উপস্থিত হতেন না। দেশের আবাল, বৃদ্ধ, বনিতারাও যার যার অবস্থান থেকে ‘অবিসংবাদিত’ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সমীহ করেছেন। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় দেশের রাজনীতিতে বিএনপি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তার প্রয়াণের পর দলটি আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সোজা কথায় বলা চলে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া বিএনপির রাজনীতি চিন্তা করা কষ্টসাধ্য। খালেদা জিয়ার কারণেই আগামী নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে থাকবে।

প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি। তার প্রমাণ তারেক রহমান দেশে ফেরার পর সংবর্ধনা জানাতে মানুষের স্রোত এবং খালেদা জিয়ার জানাজায় স্মরণকালের ঐতিহাসিক উপস্থিতিই তার প্রমাণ। এই জনসমর্থন আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে এগিয়ে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজ বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিরোধীদলকে দমিয়ে রাখতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে, তার প্রমাণ খালেদা জিয়ার জানাজা এবং তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের অনুষ্ঠানে লাখ লাখ জনতার উপস্থিতি। এতেই বোঝা যায় বিএনপি জনপ্রিয়তায় কতটা এগিয়ে রয়েছে।

কলাপাড়ার কথা

কলাপাড়া

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

খালেদার জানাজায় বিপুল উপস্থিতি বিএনপির নির্বাচনে জোয়ার এনেছে

আপডেট সময় : ১২:৫৬:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ইতিহাসের সর্ববৃহৎ গণজমায়েতকে জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই বিপুল মানুষের উপস্থিতি শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের অংকে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে।

দল-মত নির্বিশেষে খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের সহানুভূতি, ভালোবাসা ও আবেগ বিএনপি এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি জনসমর্থন বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন ও দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিএনপিকে নতুন করে জনমনে জায়গা করে দিচ্ছে।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নেন কোটির বেশি মানুষ। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার মূল মাঠ, সংলগ্ন দুটি মাঠ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, খামারবাড়ি মোড় থেকে ফার্মগেট হয়ে কারওয়ানবাজার পার হয়ে প্রায় শাহবাগ, বিজয় সরণি হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়কজুড়ে কাতারবদ্ধ হয়ে জানাজায় অংশ নেয় সাধারণ মানুষ। চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনের সড়ক, শিশুমেলা থেকে আসাদগেট হয়ে ধানমন্ডি ৩২ পর্যন্ত এলাকাতেও ছিল মানুষের ঢল। অন্যদিকে শিশুমেলা থেকে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত ছিল মানুষের ঢল।এছাড়া নিচের সড়কে জায়গা না পেয়ে এক্সপ্রেসওয়ে, বিভিন্ন ভবনের ছাদ, ফুট ওভার ব্রিজ ও মেট্রো স্টেশনের ভেতরেও মানুষ কাতারবদ্ধ হয়ে জানাজায় অংশ নেয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, এক থেকে দেড় কোটি মানুষ মানুষ সরাসরি জানাজায় অংশ নেয়। এছাড়া সারা দেশের জেলা-উপজেলায় গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন আরও লাখ লাখ মানুষ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃশ্য বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।তারা মনে করছেন, জানাজা ঘিরে সৃষ্টি হওয়া আবেগ ও জনসমর্থন আগামী নির্বাচনের মাঠে দলীয় কর্মীদের আরও সক্রিয় ও সংগঠিত ভূমিকা রাখতে অনুপ্রাণিত করবে।

জানাজায় রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, তিন বাহিনী প্রধান, শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, আলেম-ওলামা ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও জানাজাটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্পিকারসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিএনপির প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে একটি ইতিবাচক মনোভাব ও সহানুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, খালেদা জিয়ার জানাজায় এই বিপুল গণজমায়েত বিএনপির প্রতি জনমতের শক্ত অবস্থানকেই দৃশ্যমান করেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে আবেগ বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে, এ বাস্তবতায় খালেদা জিয়াকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সব মিলিয়ে, খালেদা জিয়ার জানাজা শুধু একজন নেত্রীর শেষ বিদায় নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে জনমত গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব আগামী নির্বাচনের ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয় বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

কেন খালেদা জিয়া জনমানুষের হয়ে উঠেছেন?
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি সংবিধান স্থগিত করে সামরিক আইন জারি করেন। এতে গণতন্ত্র চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৮৩ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপির নেতৃত্বে আসেন খালেদা জিয়া। তিনি প্রথমে এককভাবে ও পরে ৭ দলীয় জোট গঠন করে এরশাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জন করে বিরোধিতা করেন, যা তৎকালীন বিরোধীদের মধ্যে দৃঢ় নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে। ১৯৮৭-৯০ পর্যন্ত টানা হরতাল, মিছিল, সমাবেশ, গণআন্দোলনের মাধ্যমে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ঘটে, যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া ও বিএনপি।

১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক এরশাদকে পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জয়ী হয়। খালেদা জিয়াই প্রথম গণভোটের মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেন, যা গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করে। ১৯৯১ সালের বারোতম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্সিয়াল থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেন তিনি, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তনের অন্যতম বড় মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। খালেদা জিয়ার আমলেই ১৯৯৬ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।

বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তিনি গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। সংসদে ও সংসদের বাইরেও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ও সেটি বাস্তবায়ন করেন খালেদা জিয়া। যার ফলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম হয়, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য বড় অর্জন।

তার আমলেই নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের ক্ষেত্র তৈরি হয়। সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসারেও খালেদা জিয়া ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রহরণ শুরু হয়। প্রতিরোধ গড়ে তোলেন খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে। দলটির প্রধান শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা পাওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতাদের প্রতি দমনমূলক আচরণ শুরু করেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী দলের কার্যক্রমে বাধা, রাজনৈতিক হত্যা ও হয়রানির অভিযোগ করে বিএনপি।

আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে ২০০৯ সালে। প্রারম্ভ হয় একদলীয় শাসনের। দেশের গণতন্ত্র ভেঙে টুকরো টুকরো হতে থাকে। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয় আওয়ামী প্রহসন। খালেদা জিয়া ও তার দলের শীর্ষ নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের খড়্গ চালাতে থাকে আওয়ামী সরকার। সে বছর শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত হয় একতরফা নির্বাচন। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি বড় দল সেই নির্বাচন বর্জন করে। এতে শতাধিক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ হয় আওয়ামী লীগ। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় ২০১৮ সালের নির্বাচনেও। সেবার ব্যাপক কারচুপি, ভোট ডাকাতি ও ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে ক্ষমতা নেয় আওয়ামী লীগ। এরপর থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা, গ্রেপ্তার ও বিচারবহির্ভূত দমননীতি চালু করে দলটি।

এতসব ঘটনার পরও খালেদা জিয়া দৃঢ় ছিলেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করতে তিনি জনগণকে সংগঠিত করেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যান। তার তোপ দিন দিন এত বেশি প্রগাঢ় হতে শুরু করে, ভয় পেয়ে যায় শাসক দল। ফলে তার বিরুদ্ধে শুরু হয় রাজনৈতিক হয়রানি। ২০১৮ সালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার। কারাগারে বারে বারে অসুস্থ হন বিএনপি চেয়ারপারসন। একে তো বন্দিদশা, তার ওপর শারীরিক অসুস্থতা। তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি অপরাজনীতির কুশীলবরা। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি থেকে পিছু হটেননি খালেদা জিয়া।

২০২৪ সালের নির্বাচনে আমি-ডামি ভোট করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গলা কাটে আওয়ামী লীগ। অসুস্থ অবস্থায় তখনও বন্দী খালেদা জিয়া। তারপরও দেশ ও দশের কথা চিন্তা করেছেন তিনি। প্রকাশ্যে বা প্রত্যক্ষভাবে না হলেও আন্দোলন চালিয়ে যেতে গোটা দেশের মানুষের প্রতি বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি। নেতাকর্মীদের ধরে রেখেছিলেন আপসহীনতার চাদরে। কোটা প্রথা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফ্যাসিস্ট সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ৩৬ দিনের আন্দোলনে দেশবাসী কালো আওয়ামী খোলস ছিঁড়ে ফেলে। দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন হয়। খালেদা জিয়া মুক্তি পান বর্বরদের মিথ্যা থেকে। সাজানো নাটক থেকে। মুক্ত বাতাসে খালেদা দেন সহনশীলতার বার্তা।

চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপটে পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। এই পরিস্থিতিতে ওই বছরের ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির এক সমাবেশে সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তা দেন দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি বলেছিলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।’ তার কণ্ঠে সেই উচ্চারণ দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা প্রশমনে ভূমিকা রাখে, দেশবাসী খুঁজে পায় সাহস।

পুলিশ কর্মকর্তারাই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, বেগম জিয়ার সংযত ও দায়িত্বশীল বক্তব্যে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান যেমন ছিল, তেমনি ছিল দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর মমতা। কঠিন সেই সময়ে তার কণ্ঠে দেশবাসী খুঁজে পেয়েছিল সাহস, স্থিরতা ও আশার বার্তা। 

এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্তব্য করেছিলেন যা দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত অনুধাবন করে। যেমন, ‘ওদের হাতে গোলামীর জিঞ্জির আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি আওয়ামী লীগকে কেবল একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে নয়, বরং একটি নির্ভরশীল, পরাধীন ও ক্ষমতা-আসক্ত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। তার এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, তারা দেশের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না হয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ভর করেছে বিদেশি সমর্থন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দমনমূলক ব্যবস্থার ওপর।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিএনপি বিশ্বাসকে তুলে ধরেছিলেন। শহীদ জিয়ার পর তার হাতেই বহুদলীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম রাষ্ট্রচিন্তার ধারণা রক্ষা পেয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া কেবলই গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানার বিষয়ে চিন্তা করতেন। 

১/১১’র সময়কার সরকার দেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু’ ফরমুলা নিয়ে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া এমন হঠকারী চিন্তা নিয়ে কখনোই বিচলিত ছিলেন না। নিজের ও সন্তানদের চিন্তা না করে তিনি বরাবরই দেশ ও জাতিকে বেছে নিয়েছিলেন। এক সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার এই স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’

তাকে বার বার দেশ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল। এমনকি শহীদ জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। এ ঘটনায় বেগম জিয়া বিবশ হয়ে পড়লেও বিচলিত হয়ে যাননি। তিনি এই দেশকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসতেন। 

‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। দেশই হলো আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মাটি মানুষই আমার সবকিছু। এমন আবেগমাখা বক্তব্যও তিনি দিয়েছিলেন বিদেশের মাটিতে বসে। চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সময়ও তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। 

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমণ আকস্মিক হলেও তার এই যাত্রা ছিল দেশের মানুষকে নিয়ে পরিকল্পিত। কারণ তিনি দেশের প্রতিটি মানুষকে নিয়ে চিন্তা করতেন। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলের মানুষের জন্যও তিনি চিন্তা করতেন। তা না হলে শাপলা চত্বরে আওয়ামী হত্যাকাণ্ডকে তিনি কখনোই গণহত্যা বলতে পারতেন না। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কাদের মোল্লাদের গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ডকে তিনি ‘মিথ্যা রায়’ বলে আখ্যা দিতে পারতেন না। 

বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিও ছিল প্রখর। তিনি বলেছিলেন, এদের (আওয়ামী লীগ) পচতে আরও একটু সময় দিতে হবে। এজন্য আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। এই আওয়ামী লীগ একদিন পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়াবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন এই সরকার জনবিক্ষোভে ‘করুণভাবে’ বিদায় নেবে। সবাই যখন এদের বিরুদ্ধে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে, তখন তারা জনগণের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। ঘটেছেও তাই। দেশের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল বলেই আওয়ামী লীগ দেশ থেকে পালিয়েছে। কিন্তু রয়ে গেছেন খালেদা জিয়া। তার মা, মাটি ও মানুষের কাছে। 

বিএনপি সরকারের এ সফলতা দেখে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো উপবৃত্তি কর্মসূচি ও নারী শিক্ষাবিষয়ক প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহী হয়ে ওঠে। নরওয়ে, কানাডা, ও জার্মানি সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি নারী শিক্ষা প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষায় সবচেয়ে দ্রুত উন্নত দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে। নারী শিক্ষায় সরকারের কার্যক্রম জাতিসংঘের বিভিন্ন শিক্ষা ও উন্নয়ন সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বেইজিং বিশ্ব নারী সম্মেলন ১৯৯৫।

এসব কারণেই বেগম জিয়া দেশ ও জাতির হতে পেরেছিলেন। কেবল শেখ হাসিনা ও তার মত প্রকাশ করেন এমন হাতে গোনা কয়েকজন রাজনৈতিক তাকে সম্মান করেননি, কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন সর্বজন স্বীকৃত এমন সম্মানিত ব্যক্তি। নয়ত কোটিরও বেশি মানুষ তার জানাজায় উপস্থিত হতেন না। দেশের আবাল, বৃদ্ধ, বনিতারাও যার যার অবস্থান থেকে ‘অবিসংবাদিত’ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সমীহ করেছেন। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় দেশের রাজনীতিতে বিএনপি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তার প্রয়াণের পর দলটি আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সোজা কথায় বলা চলে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া বিএনপির রাজনীতি চিন্তা করা কষ্টসাধ্য। খালেদা জিয়ার কারণেই আগামী নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে থাকবে।

প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি। তার প্রমাণ তারেক রহমান দেশে ফেরার পর সংবর্ধনা জানাতে মানুষের স্রোত এবং খালেদা জিয়ার জানাজায় স্মরণকালের ঐতিহাসিক উপস্থিতিই তার প্রমাণ। এই জনসমর্থন আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে এগিয়ে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজ বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিরোধীদলকে দমিয়ে রাখতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে, তার প্রমাণ খালেদা জিয়ার জানাজা এবং তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের অনুষ্ঠানে লাখ লাখ জনতার উপস্থিতি। এতেই বোঝা যায় বিএনপি জনপ্রিয়তায় কতটা এগিয়ে রয়েছে।

কলাপাড়ার কথা

কলাপাড়া